শুক্রবার, আগস্ট ২৩, ২০১৯
প্রচ্ছদ সাহিত্য ও সংস্কৃতি কয়েক শতাব্দি চাঁদ ছিল মানুষের কাছে কিংবদন্তি

কয়েক শতাব্দি চাঁদ ছিল মানুষের কাছে কিংবদন্তি

কয়েক সহস্রাব্দ ধরে চাঁদ ছিল মানুষের কাছে কিংবদন্তি। মানুষ বিশ্বাস করত যে চাঁদ আমাদের আচরণ, মনের অবস্থা এমনকি ভাগ্যও নিয়ন্ত্রণ করে। এসব ধারণা মানুষের নানা সৃষ্টিশীল কাজেও প্রকাশিত হয়েছে; শিল্প-সাহিত্যে তাই চাঁদের উপস্থিতি হরহামেশাই দেখা যায়

আমরা কখনই চাঁদের কাছাকাছি ছিলাম না। তার পরও ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবারের মতো চাঁদের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এর আগে চাঁদের বাস্তবতা নিয়ে মানুষের কোনো সম্যক ধারণা ছিল না। ১৯৬৯ সালে মানুষ চাঁদের বুকে পা রাখে। অজানা দুনিয়ার মানুষের কাছে চাঁদ চেনা হয়ে যায়। তবে এখনো অনেক চেনার বাকি আছে।

কয়েক সহস্রাব্দ ধরে চাঁদ ছিল মানুষের কিংবদন্তি। এসব অনুসারে মানুষ বিশ্বাস করত যে চাঁদ আমাদের আচরণ, মনের অবস্থা এমনকি ভাগ্যও নিয়ন্ত্রণ করে। এসব ধারণা মানুষের নানা সৃষ্টিশীল কাজেও প্রকাশিত হয়েছে; শিল্প-সাহিত্যে চাঁদের উপস্থিতি হরহামেশাই দেখা যায়।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার শিল্প ঐতিহাসিক ডেভিড বার্ডিন বলেন, ‘টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে শিল্পী ও অপেশাদার মহাকাশ গবেষকরা চাঁদের দিকে তাকিয়ে একে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন। এবং এসব ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট সময়ের ধর্মীয় ও দার্শনিক ধারণার সঙ্গে মেলানো হতো।’ তার মতে, শিল্প চেষ্টা করে কোনো একটি কালপর্বে মানুষের মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব দিতে। চাঁদকে চিত্রিত করার সবচেয়ে পুরনো যে নিদর্শনটি পাওয়া যায়, সেটা ব্রোঞ্জ যুগের। এটি একটি দ্বিমাত্রিক ভাস্কর্য। স্বর্ণ ও আরো কিছু ধাতু দিয়ে তৈরি এ ভাস্কর্য ‘নেবরা স্কাই ডিস্ক’ নামে পরিচিত। জার্মানিতে যেখানে এটি পাওয়া গেছে, সে স্থানের নামের সঙ্গে মিল রেখেই এমন নামকরণ। এটি তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ অব্দে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে পুরনো নকশাগুলোর একটি এ ডিস্ক। শিল্প ঐতিহাসিকদের মতে, নেবরা স্কাই ডিস্ক সম্ভবত একটি জ্যোতির্বিদ্যা গবেষণাসংক্রান্ত কোনো উপকরণ। এটা থেকে ব্রোঞ্জ যুগে মানুষ কীভাবে আকাশকে পর্যবেক্ষণ করত, সে সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

এর বহু শতক পরে পুবের দুনিয়ায় দেখা যায় অর্ধচন্দ্র। স্টেল অব নাবোনিডাস নামের এ ভাস্কর্যে দেখা যায় অর্ধেক চাঁদ। প্রাচীন ব্যাবিলনে রাজা নাবোনিডাস চাঁদের দেবতা সিনকে পূজা করতেন। আর সেই সিনের প্রতীক ছিল অর্ধচন্দ্র। এ নিদর্শন খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের। সেটা ছিল শেষ নিউ-ব্যাবিলনিয়ান যুগ। এ যুগে চাঁদের পূজা ছিল সাধারণ চর্চা। এসব পুরনো নিদর্শনে চাঁদকে কোনো দেবীর ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ বিষয়ে মানুষের ধারণা এবং চাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে।

১৬০৯ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি তুসকানির পাহাড় থেকে তার নতুন টেলিস্কোপ দিয়ে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেন। এতদিন খালি চোখে দেখা সরল বস্তুটিই কেমন করে এক নিমেষে জটিল হয়ে উঠল। রং-তুলি নিয়ে কয়েক মাসের চেষ্টায় টেলিস্কোপে দেখা চাঁদের চেহারা গ্যালিলিও এঁকে ফেলেন। এরপর তিনি তার ড্রইংগুলো সিডেরিয়াস নানসিয়াস নামের জার্নালে প্রকাশ করেন। এ কাজে ফ্লোরেন্সের মেডেসি পরিবার তাকে সাহায্য করেছিল। গ্যালিলিওর আঁকা ছবিতে দেখা গেল চাঁদের বুকে দুনিয়ার মতোই উপত্যকা, আগ্নেয়মুখ আছে।

গ্যালিলিওর আবিষ্কারের পরও শিল্পীদের মন থেকে চাঁদের সমতল, নিখুঁত চেহারাটি মুছে যায়নি। লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারির গবেষণা পরিচালক ক্যারোলিন ক্যাম্পবেল বলেন, ‘শিল্পীরা চাঁদকে প্রতীকীরূপে ব্যবহার করেছেন। তবে যে চেহারায় তারা চাঁদকে এঁকেছেন, তার সঙ্গে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের খুব বেশি সম্পর্ক নেই। অজানা কিছুকে উপস্থাপন করতে চাঁদ ছিল একটি শক্তিশালী মাধ্যম।’

গ্যালিলিওর ৩০০ বছর পর জাপানি কাঠের ব্লক শিল্পী তাইসো ইয়োশিতোশি ‘চাঁদের ১০০ রূপ’ শিরোনামে একটি সিরিজ তৈরি করেন। তাইসো এ সিরিজের মাধ্যমে চাঁদকে নিয়ে চীনা ও জাপানি পুরাণগুলো তুলে ধরেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটি ছিল কাসিয়া ট্রি মুন। এতে হান রাজত্বের রাজা উ গ্যাংকে তুলে ধরা হয়েছিল। ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য উ গ্যাংয়ের সাজা হয়েছিল চাঁদের জন্মানো কাসিয়া গাছ কাটার। এ গাছ কাটলেই নতুন করে গজিয়ে যেত, তাই রাজাকে সারাক্ষণ গাছ কাটতে হতো।

পশ্চিমা দুনিয়ায় চাঁদের কল্পনার শৈল্পিক উপস্থাপনা চূড়ান্ত রূপ পায় উনিশ শতকে। ১৮৮৯ সালে অ্যাসাইলামে থাকাকালে ভিনসেন্ট ভ্যান গখ তার বিছানার পাশের জানালা থেকে চাঁদ দেখতেন। তার ‘স্টারি নাইট’ ছবিতে এ চাঁদ অমর হয়ে আছে। ছবিটি রাতের চাঁদকে কোনো রকম পুরাণ বা ধর্মীয় বিশ্বাসের আশ্রয় না করে প্রকাশ করা হয়েছে এবং ছবিটি এ রকম নিদর্শনের অন্যতম একটি।

১৮৬৫ সালে প্রকাশিত জুল ভার্নের ‘ফ্রম দি আর্থ টু দ্য মুন’ বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছিলেন অঁরি দে মঁতে। এতে দেখা যায় একটা বিরাট আকার রকেট চাঁদের দিকে উড়ে যাচ্ছে। জুল ভার্নের এ বইয়ের মাধ্যমে চাঁদ প্রতীকী কিংবা বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের বাইরে নতুন একটি পরিচয় পায়। চাঁদ এবার হয়ে উঠল মানুষের গন্তব্য। জুল ভার্নের বইটি প্রকাশের প্রায় শত বছর এবং নেবরা স্কাই ডিস্ক তৈরির প্রায় চার হাজার বছর পরে নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে মানুষের পদচিহ্ন এঁকে দেন। সারা দুনিয়ার মানুষ সেই ভিডিও দেখেছেন। কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ যে চাঁদকে নিয়ে কল্পনা করেছে, প্রতীক-দেবী হিসেবে জেনেছে, এবার তার বুকেই দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। চাঁদ অর্থহীন কোনো প্রতীক নয় বরং মানুষের সামষ্টিক ইতিহাস ও স্মৃতির অংশ।

Facebook Comments

সর্বশেষ

সোনারগাঁয়ে শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শোভাযাত্রা!

সোনারগাঁয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে  দিনব্যাপী ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব শুরু হয়েছে। শুক্রবার (২৩ আগস্ট) সকালে উপজেলার বানিনাথপুর গৌর নিতাই আখড়ার সামনে থেকে বিশ্ব শান্তির কামনায় আয়োজিত...
Facebook Comments
Shares