27 C
Nārāyanganj
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২১

ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদ মিছিল না’গঞ্জ থেকেই সূচনা

দ্যা বাংলা এক্সপ্রেস ডটকম: প্রায় ৬৯ বসর আগে ঠিক ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে আমাদের প্রিয় নারায়নগঞ্জে কি ঘটেছিলো তার কিছু চিত্র আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন এবং ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষনে সহায়ক হবে বলে মনে করি।

এই দিনটি ছিল ভাষা সৈনিক মরহুম গোলাম রব্বানি খানের বিয়ের পুর্বদিন অর্থাৎ গায়ে হলুদের দিন। উনার পিতা পুর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য ও ডেপুটি স্পীকার  (তিনি ব্যাক্তিজীবনে  শেরে বাংলা ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।) জনাব মরহুম আবদুস সামাদ খানের গলাচিপাস্থ  ৪০ নং কলেজ রোডের বাড়ীতেই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নারায়নগঞ্জের গণ্যমান্য সহ বহু মানুষ  আমন্ত্রিত ছিলো এই অনুষ্ঠানে ।   

গোলাম রব্বানী খান সহ তার ঘনিষ্ঠ সবাই তখন রাজনীতি ও ভাষা আন্দোলনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু ২০শে ফেব্রুয়ারি যখন ভাষার দাবীতে পরিস্থিতি খুব খারাপ দিকে যাচ্ছিলো, সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ঢাকাতে ১৪৪ ধারা জারী করা হলো তখন ঐ রাতেই সিদ্ধান্ত হলো যে পরবর্তী দিন ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকাতে ১৪৪ ধারা ভেংগে রাস্ট্র ভাষার দাবীতে কর্মসূচী পালন করা হবে। 

এই পরিস্থিতিতে রব্বানী সাহেবের হলুদের অনুষ্ঠান হবে কিনা স্থগিত করা হবে এবং ২১শে ফেব্রুয়ারিতে  ভাষার দাবীতে নারায়নগঞ্জের কর্মসুচী কি হবে তা নির্ধারনে নারায়নগঞ্জের নেতৃবৃন্দ ২০শে ফেব্রুয়ারি রাতেই এম এল এ সামাদ সাহেবের কলেজ রোডের বাসভবনে মিলিত হন। ঐ বৈঠকে অন্যান্যদের সাথে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা শফি হোসেন খান, মরহুম সামসুজ্জোহা সাহেব (মাননীয় সাংসদ শামিম ওসমান সাহেবের পিতা) মরহুম জালালুদ্দিন আহমেদ ( কুতুব উদ্দিন আকসিরের বড় ভাই), মরহুম আসরাফউদ্দিন আহমেদ,  মরহুম বাদশা মিয়া, মরহুম মুলকুতুর রহমান সহ নারায়ণগঞ্জ এর প্রথম সারির প্রায় সবাই উপস্থিত ছিল। 

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যেহেতু সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ সেহেতু গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানটি বহাল রেখে এর আচলেই ব্যাপক সমাগম প্রস্তুত রাখা এবং ঢাকাতে ভাষা সমাবেশে কোনো নির্যাতন হলেই সাথে সাথে এর প্রতিবাদ করা। আর ঢাকার খবর সংগ্রহ করার জন্য রব্বানী সাহেবের গাড়ীর ড্রাইভার গলাচিপা ডি এন রোড নিবাসী মরহুম নেওয়াজ আলী পাগলকে পাঠানো হয়।

যেই পরিকল্পনা সেই অনুযায়ী কাজ। ২১ শে ফেব্রুয়ারি  দুপুরের পরপরই অনুষ্ঠানস্থল অতিথিতে পরিপুর্ন হয়ে গেলো। নারায়ণগঞ্জ এর প্রথম সারির প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন,মহিলাদের ব্যাপক সমাগম করানো হয়। উপস্থিত মহিলাদের পরনে ছিলো হলুদ রঙের শাড়ী  কাপড় আর পুরুষদের ছিলো সাদা পাঞ্জাবি। হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঢাকা থেকে খবর আসলো সালাম, বরকত সহ অনেককে গুলি করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার কর্মসূচীর খবর সংগ্রহের জন্য পাঠানো ড্রাইভার সাহেব মরহুম নেওয়াজ আলি সাহেবও গুলিবিদ্ধ হয়। ঢাকার খবর পাওয়ার সাথে সাথে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ  সিদ্ধান্ত  নেয় পুরুষেরা সবাই ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রেল লাক্ন এর পথ ধরে এম এল এ খান সাহেব ওসমান আলীর ( মাননীয় সাংসদ শামিম ওসমান সাহেবের দাদা )  বাসভবন চাষারার বাইতুল আমানে একত্রিত হবে।

 আর জোহা সাহেবের নির্দেশে মেয়েরা সবাই গায়ে হলুদের কাপড় পরেই মরগ্যান গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষিকা মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে মিছিল বের  করে শহর প্রদক্ষিণ করে বাইতুল আমানে একত্রিত হবে । যেই কথা সেই কাজ। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত  নিরিহ বাংগালী ছাত্র জনতার উপর পাকিস্তান সরকারের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে  মহিলাদের নেতৃত্বে হলুদ কাপড় পরিহিতদের এক বিশাল মিছিল রব্বানী সাহেবের গলাচিপার বাড়ী থেকে বেরিয়ে  নারায়ণগঞ্জ এর প্রত্যেকটি গুরুত্বপুর্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাইতুল আমানে একত্রিত হয়।

আর এটাই ছিলো ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত ভাষা শহিদদের হত্যার প্রতিবাদে বাংগালিদের প্রথম প্রতিবাদ মিছিল। আর এই মিছিলের খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে ঢাকা থেকে আসা প্যারা মিলিটারি ফোর্স কলেজ রোড এর খান বাড়ীতে এসে উপস্থিতি হয় কিন্তু  ততক্ষনে এ কে এম শামসুজ্জোহা, গোলাম রব্বানী খান, জালালউদ্দিন আহমেদ, শফি হোসেন খান,   

সবাই বাইতুল আমানে অবস্থান করে পরবর্তি করনীয় সম্পর্কে পরিকল্পনা করছিলেল, শুধু মাত্র বিশেষ  কারনে পরিকল্পনা অনুযায়ী ভাষা সৈনিক বাদশা মিয়া কলেজ রোড এর খান বাড়িতে গলাচিপা বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।   তখন বিশেষ  ফোর্স   ভাষা সৈনিক বাদশা মিয়াকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

গলাচিপাতে প্যারা মিলিটারি ফোর্সের হানা দেওয়ার খবরের সাথে সাথে বাইতুল আমানে থাকা নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার এড়াতে ও আন্দোলনকে চরম মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে ঢাকার প্যারা মিলিটারি ফোর্সের নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালীন সময়ের কয়েক ঘন্টার জন্যে সাময়িক আত্নগোপনে চলে যান।   পরবর্তীতে খান সাহেব ওসমান আলী সহ অনেকেই খুব সম্ভবত ২৯ শে ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হন। পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার হন শফি সাহেব, জালাল সাহেব, মমতাজ বেগম সহ অনেকে।

এদিকে গলাচিপা থেকে বিশেষ  ফোর্স চাষাড়া বাইতুল আমানে উপস্থিত হয়ে নেতৃবৃন্দকে না পেয়ে  বাড়িতে অবস্থানরত সবাইকে নির্মম  নির্যাতন করে যা থেকে উপস্থিত মহিলা ও বাড়ীর শিশুরাও রক্ষা পায়নি। এই ছিলো সেই দিনের কিছু খন্ডিত  ইতিহাস।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x